লার্নিং সেন্টার

হজ্জ ও উমরাহ নির্দেশিকা

সফরে শুরুর আগেই নিজেকে প্রস্তুত করুন। কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক নির্ভরযোগ্য নির্দেশিকা, নির্বাচিত গ্রন্থ, ভিডিও লেকচার এবং অন্যান্য সহায়ক রিসোর্স থেকে হজ্জ ও উমরাহ সম্পর্কে জানুন।

ধাপে ধাপে নির্দেশনা | ভিডিও লেকচার | নির্বাচিত গ্রন্থ

মাবরূর হজ্জের প্রস্তুতি

হজ্জ জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদাহ। প্রত্যেক হজ্জযাত্রীর আকাঙ্ক্ষা থাকে একটি মাবরূর হজ্জ অর্জনের—যা আল্লাহর কাছে কবুল হবে এবং যার প্রতিদান হবে তাঁর ক্ষমা ও জান্নাত। এই প্রস্তুতি শুরু হয় সফরের অনেক আগেই—আন্তরিক তাওবাহ, বিশুদ্ধ আকীদাহ, সঠিক জ্ঞান, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহমুখী অন্তরের মাধ্যমে।

মাবরূর হজ্জের ভিত্তিসমূহ

আলিমগণ এমন কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন, যেগুলো হজ্জ আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য অপরিহার্য:

ইখলাস (একনিষ্ঠতা)

হজ্জ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আদায় করুন। লোক দেখানো (রিয়া), সুনাম অর্জনের বাসনা বা সমাজে "হাজী" নামে পরিচিত হওয়ার উদ্দেশ্য থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।

হালাল উপার্জন

হজ্জের পুরো ব্যয় যেন সম্পূর্ণ হালাল উপার্জন থেকে হয়। রাসূল ﷺ বলেছেন, "আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।"

সুন্নাহর অনুসরণ

রাসূলুল্লাহ ﷺ যেভাবে হজ্জ আদায় করেছেন, ঠিক সেভাবেই হজ্জ আদায়ের চেষ্টা করুন। বিদআত থেকে দূরে থাকুন এবং ফরয, ওয়াজিব ও সুন্নাহসমূহ যথাযথভাবে পালন করুন।

গুনাহ, অশ্লীলতা ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকা

গীবত, গুনাহ, ইহরাম অবস্থায় অশ্লীল কথাবার্তা (রাফাস) এবং অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক থেকে বিরত থাকুন। ধৈর্য, উত্তম চরিত্র ও সংযম বজায় রাখুন।

উদারতা ও উত্তম চরিত্র

সহযাত্রীদের সেবায় আন্তরিক থাকুন। খাদ্য ও পানি ভাগাভাগি করুন, নম্রভাবে কথা বলুন এবং সফরের কষ্টের মাঝেও সুন্দর আচরণ বজায় রাখুন।

মাবরূর হজ্জের প্রতিদান

"মাবরূর হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।"

— সহীহ আল-বুখারী: ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম: ১৩৪৯

মাবরূর হজ্জ বান্দার গুনাহসমূহ মুছে দেয়। অন্য একটি সহীহ হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ্জ করল এবং এই দিনগুলোতে কোনো প্রকার যৌন সম্ভোগ বা অশ্লীলতা, অন্যায় আচরণ বা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলো না, সে তার মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে।" (সহীহ আল-বুখারী: ১৫২১; সহীহ মুসলিম: ১৩৫০)

ফরয ও নফল—উভয় হজ্জের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য

আলিমগণ উল্লেখ করেছেন যে, আন্তরিকতা ও সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণের সঙ্গে হজ্জ আদায় করা হলে জান্নাতের সুসংবাদ ও গুনাহ মাফের এই মহান প্রতিদান ফরয ও নফল—উভয় হজ্জের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা

এই পৃষ্ঠাটি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রস্তুত একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা। তবে এটি যোগ্য আলিমদের কাছে ইলম অর্জন, সরাসরি প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশগ্রহণ কিংবা ব্যক্তিগত মাসআলার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলিমদের কাছ থেকে ফতোয়া গ্রহণের বিকল্প নয়।

হজ্জ ও উমরাহর বিধান

হজ্জ ও উমরাহ কার ওপর ফরয, কার জন্য তা নফল এবং কোন অবস্থায় এ ইবাদাত আদায়ের বিধান প্রযোজ্য—সংক্ষেপে তা জানুন।

হজ্জের বিধান

ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ (ফরযে আইন)

হজ্জ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। জীবনে একবার হজ্জ আদায় করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর ফরযে আইন।

"আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্ব করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য"
— সূরা আলে ইমরান, ৩:৯৭
হজ্জ ফরয হওয়ার শর্তাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন (IslamQA)

উমরাহর বিধান

ওয়াজিব

সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী (শাফিঈ ও হাম্বলী মাযহাব), সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার উমরাহ আদায় করাও ওয়াজিব। তবে হানাফী ও মালেকী মাযহাবের আলিমগণ উমরাহকে সুন্নাতে মুআক্কাদাহ বলে মত দিয়েছেন।

"আর তোমরা হজ ও ‘উমরা পূর্ণ কর আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে"
— সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৯৬
উমরাহর বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন (ইংরেজি · IslamQA)

হজ্জ ফরয ও উমরাহ ওয়াজিব হওয়ার ৫টি শর্ত

নিম্নোক্ত মৌলিক শর্তগুলো পূরণ হলেই একজন ব্যক্তির ওপর হজ্জ ও উমরাহ ফরয হয়।

০১. ইসলাম

মুসলিম হওয়া

ব্যক্তি অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। ইসলামের বাইরে কারও ইবাদাত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

০২. সুস্থ বিবেক

আকল (বিবেক-বুদ্ধি)

ব্যক্তিকে সুস্থ মস্তিষ্ক ও বিবেকসম্পন্ন হতে হবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি এ দায়িত্বের আওতাভুক্ত নন।

০৩. বালেগ হওয়া

বুলূগ (প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া)

ব্যক্তি বালেগ হতে হবে। শিশু হজ্জ করলে সওয়াব পাবে, তবে তা তার ফরয হজ্জ হিসেবে গণ্য হবে না।

০৪. স্বাধীনতা

স্বাধীন হওয়া

ব্যক্তি স্বাধীন হতে হবে। এটি মূলত দাসপ্রথার যুগের একটি শর্ত; বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হয়।

০৫. সামর্থ্য

ইস্তিতা'আহ (সামর্থ্য)

যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য, পাশাপাশি নিরাপদে হজ্জ সম্পন্ন করার মতো শারীরিক সক্ষমতা থাকতে হবে।

নারীদের জন্য অতিরিক্ত শর্ত নারীর ওপর হজ্জ ফরয হওয়ার জন্য উপরোক্ত পাঁচটি শর্তের পাশাপাশি একজন মাহরাম (স্বামী অথবা এমন পুরুষ আত্মীয়, যাকে তিনি স্থায়ীভাবে বিয়ে করতে পারেন না) সঙ্গে থাকা আবশ্যক। মাহরাম না থাকলে তিনি মাহরাম প্রাপ্তি পর্যন্ত হজ্জের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন।

উমরাহ আদায়ের পদ্ধতি

সহীহ সুন্নাহর আলোকে উমরাহর অপরিহার্য আমলগুলোর সংক্ষিপ্ত ধাপে ধাপে নির্দেশিকা।

ধাপ 1 / 6

ইহরামে প্রবেশ

প্রথমে ইহরামে প্রবেশ করুন। গোসল করুন, শরীরে (কাপড়ে নয়) সুগন্ধি ব্যবহার করুন (শুধু পুরুষদের জন্য), পুরুষরা ইহরামের দুই টুকরা কাপড় পরিধান করুন এবং নারীরা শালীন শরঈ পোশাক পরিধান করুন। এরপর উমরাহর নিয়ত করে ইহরামে প্রবেশ করুন। ইহরাম কেবল একটি বিশেষ পোশাকের নাম নয়; বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদতের অবস্থা, যাতে মীকাত অতিক্রমের সময় নিয়তের মাধ্যমে একজন মুসলিম উমরাহ বা হজ্জের জন্য প্রবেশ করেন। ইহরামে প্রবেশের পর নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ কার্যকর হয়।

উমরাহর নিয়ত (তালবিয়ার সূচনা)
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ عُمْرَةً
"হে আল্লাহ! আমি উমরাহ আদায়ের জন্য উপস্থিত হলাম।"
ইহরাম অবস্থায় প্রধান নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ:
  • শরীরের কোনো অংশের চুল উপড়ে ফেলা, কাটা বা মুণ্ডন করা এবং হাত-পায়ের নখ কাটা।
  • সুগন্ধি, আতর বা সুগন্ধযুক্ত সাবান, শ্যাম্পু ইত্যাদি ব্যবহার করা।
  • পুরুষদের জন্য: মাথা এমন কিছু দিয়ে ঢেকে রাখা যা মাথার সঙ্গে লেগে থাকে (যেমন টুপি), অথবা সেলাই করা/আকৃতি অনুযায়ী তৈরি পোশাক পরিধান করা।
  • নারীদের জন্য: নিকাব বা দস্তানা পরিধান করা (প্রয়োজনে মাথার উপর থেকে আলাদা কাপড় ঝুলিয়ে দিয়ে মুখ ঢাকা যাবে)।
  • বিবাহ সম্পাদন করা, বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া অথবা দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করা।
  • স্থলচর প্রাণী শিকার করা বা হারাম এলাকার সবুজ গাছপালা কাটা বা উপড়ে ফেলা।

তালবিয়া পাঠ

ইহরামে প্রবেশের পর তালবিয়া পাঠ করুন এবং মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ শুরু করা পর্যন্ত তা বারবার পাঠ করতে থাকুন। এই তালবিয়া আল্লাহর আহ্বানে আপনার সাড়া দেওয়ার ঘোষণা এবং ইবাদতের প্রতি আপনার একনিষ্ঠতার প্রকাশ।

তালবিয়া
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
"হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত। আমি উপস্থিত। আপনার কোনো শরীক নেই, আমি উপস্থিত। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, সকল নিয়ামত এবং সকল সার্বভৌমত্ব আপনারই। আপনার কোনো শরীক নেই।"
পুরুষরা মাঝারি উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন, আর নারীরা কেবল নিজেরা শোনার মতো নিম্নস্বরে পাঠ করবেন। তালবিয়া অধিক পরিমাণে পাঠ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। তবে সমস্বরে বা দলবদ্ধভাবে তালবিয়া পাঠ করা সুন্নাহসম্মত নয়।

উমরাহর তাওয়াফ

হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) থেকে শুরু করে কাবাঘরকে বাম পাশে রেখে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সাত চক্কর তাওয়াফ করুন। প্রতি চক্করের শুরুতে হাজরে আসওয়াদের বরাবর এলে "আল্লাহু আকবার" বলুন। তাওয়াফের পুরো সময় জুড়ে যিকির, দু'আ এবং কুরআন তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকুন।

রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী দু'আ
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।"
পুরুষরা প্রথম তিন চক্করে দ্রুত পদক্ষেপে (রমল) চলবেন এবং পুরো তাওয়াফজুড়ে ডান কাঁধ খোলা রাখবেন (ইদতিবা')। এগুলো কেবল পুরুষদের জন্য সুন্নাহ।

রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী দু'আ ছাড়া তাওয়াফের প্রতিটি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দু'আ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। তাই কুরআন তিলাওয়াত করুন, যিকির করুন, সুন্নাহসম্মত যেকোনো দু'আ পড়ুন অথবা নিজের ভাষায় দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করুন।

দুই রাকা'আত সালাত আদায় ও জমজমের পানি পান

তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর সম্ভব হলে মাকামে ইবরাহীমের পেছনে দুই রাকাআত সালাত আদায় করুন। যদি সেখানে সুযোগ না থাকে, তবে মসজিদুল হারামের যেকোনো স্থানে আদায় করুন। এরপর জমজমের পানি পান করুন।

জমজমের পানি পান করার সময়
بِسْمِ ٱللّٰهِ
"আল্লাহর নামে।" জমজমের পানি পান করার সময় নিজের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য দু'আ করা সুন্নাহ, কেননা জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, আল্লাহর ইচ্ছায় তা-ই লাভ হয়।
প্রথম রাকাআতে সূরা আল-কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা আল-ইখলাস তিলাওয়াত করা সুন্নাহ। জমজমের পানি পান করার পর আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে নিজের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য দু'আ করুন।

সাঈ

সাফা পাহাড় থেকে শুরু করে মারওয়ায় শেষ করে সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী পথে মোট সাতবার আসা-যাওয়া করুন।

সাফা পাহাড়ে আরোহণের সময়
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ
"নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।"
সাফা ও মারওয়ার উপর নবী ﷺ-এর দু'আ
لَا إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الـمُلْكُ ولَهُ الـحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيءٍ قَديرٌ، لَا إلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ
"আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। সকল রাজত্ব তাঁরই এবং সকল প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সমস্ত মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করেছেন।"
সাঈ চলাকালীন কুরআন তিলাওয়াত করুন, যিকির করুন এবং বেশি বেশি দু'আ করুন। পুরুষরা সবুজ চিহ্নিত দুই স্থানের মধ্যবর্তী অংশে হালকা দৌড়াবেন। সাফা ও মারওয়ার চূড়ায় কিবলামুখী হয়ে দু'আ করুন। নবী ﷺ-এর দু'আ টি তিনবার পাঠ করা এবং প্রতিবারের মাঝখানে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দু'আ করা সুন্নাহ।

চুল মুণ্ডন বা ছাঁটা

উমরাহর সর্বশেষ আমল হিসেবে পুরুষরা মাথা মুণ্ডন (হালক) করবেন অথবা সমানভাবে চুল ছোট করবেন (তাকসীর)। পুরুষদের জন্য মাথা মুণ্ডন করা উত্তম। নারীরা তাঁদের চুলের প্রান্ত থেকে আঙুলের এক গিঁট পরিমাণ কেটে নেবেন। এর মাধ্যমে আপনার উমরাহ সম্পন্ন হবে এবং ইহরামের সব বিধিনিষেধ শেষ হয়ে যাবে।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ الصَّالِحَاتُ
"সকল প্রশংসা আল্লাহর, যাঁর অনুগ্রহেই সৎকাজসমূহ পরিপূর্ণতা লাভ করে।"
এই আমল সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে আপনার উমরাহ শেষ হলো এবং ইহরামের সব বিধিনিষেধ থেকে আপনি সম্পূর্ণ মুক্ত হলেন। আলহামদুলিল্লাহ।
উমরাহর পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা পড়ুন

হজ্জ আদায়ের পদ্ধতিসমূহ

হজ্জ আদায়ের তিনটি শরঈভাবে বৈধ পদ্ধতি রয়েছে। এগুলোর পার্থক্য জানা থাকলে হজ্জের নিয়ত ও করণীয় সহজে বুঝতে সুবিধা হয়।

তামাত্তু'

Umrah followed by Hajjপ্রথমে উমরাহ, এরপর হজ্জ

হজ্জের মাসগুলোতে একজন হজ্জযাত্রী কেবল উমরাহর নিয়তে ইহরামে প্রবেশ করেন। উমরাহ সম্পন্ন করার পর ইহরাম থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে স্বাভাবিক পোশাকে এবং অবস্থায় থাকেন। এরপর ৮ জিলহজ্জে পুনরায় হজ্জের নিয়তে নতুন করে ইহরাম করেন।

  • উমরাহ এবং হজ্জের জন্য পৃথক ইহরাম
  • হাদী (কুরবানি) ওয়াজিব
  • অধিক সুবিধাজনক

ক্বিরান

একই ইহরামে উমরাহ ও হজ্জ

হজ্জযাত্রী উমরাহ ও হজ্জ—উভয়ের নিয়তে একবারই ইহরাম প্রবেশ করেন। উমরাহ সম্পন্ন করলেও তিনি ইহরাম থেকে বের হন না; একই ইহরামে হজ্জের সকল আমল সম্পন্ন করেন।

  • শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই ইহরাম
  • হাদী (কুরবানি) ওয়াজিব
  • অধিক ধৈর্য ও সংযম প্রয়োজন

ইফরাদ

শুধু হজ্জ

হজ্জযাত্রী শুধুমাত্র হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধেন। এই পদ্ধতিতে উমরাহ অন্তর্ভুক্ত থাকে না। তিনি ঈদের দিন জামারাতে পাথর নিক্ষেপ এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছাঁটা পর্যন্ত ইহরামের অবস্থায় থাকেন।

  • কেবল হজ্জের জন্য নির্ধারিত
  • হাদী (কুরবানি) ওয়াজিব নয়
  • মক্কাবাসীদের জন্য অধিক উপযোগী

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাংলাদেশ থেকে হজ্জে যাওয়া অধিকাংশ হাজী তামাত্তু' হজ্জ আদায় করেন। এটিই সর্বোত্তম হজ্জের পদ্ধতি; রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সাহাবীগণকে এ পদ্ধতিই গ্রহণ করতে নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছিলেন। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্য পদ্ধতিও অনুসরণ করা হতে পারে। আপনার হজ্জ গাইড এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন।

Reference: IslamQA (The best type of Hajj)

হজ্জের ধাপে ধাপে সফর

৮ জিলহজ্জ থেকে শুরু করে হজ্জের প্রতিটি ধাপ সহজ ও ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করুন।

উমরাহ থেকে তামাত্তু' হজ্জ

বাংলাদেশ থেকে আগত অধিকাংশ হজ্জযাত্রী তামাত্তু' হজ্জ আদায় করেন। এই পদ্ধতিতে প্রথমে উমরাহ আদায় করা হয় (যার ধাপে ধাপে নির্দেশনা উপরের অংশে দেওয়া হয়েছে)। উমরাহ সম্পন্ন হলে ইহরাম থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক পোশাকে ফিরে আসা যায়। এরপর ৮ জিলহজ্জে নিজ অবস্থানস্থল থেকে পুনরায় ইহরাম বেঁধে হজ্জের ধারাবাহিক আমল শুরু হয়, যার ধাপগুলো নিচে তুলে ধরা হয়েছে।

ধাপ 1 / 12

৮ জিলহজ্জ পুনরায় ইহরামে পুনঃপ্রবেশ রুকন

৮ জিলহজ্জের সকালে গোসল করুন। (পুরুষরা) শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করুন (ইহরামের কাপড়ে নয়), পুরুষরা ইহরামের দুই টুকরা কাপড় পরিধান করুন এবং নারীরা শালীন শরঈ পোশাক পরিধান করুন। এবং নিম্নের নিয়্যাতের মাধ্যমে ইহরামে প্রবেশ করুন। ইহরামে প্রবেশের পর ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ সকল বিষয় প্রযোজ্য হবে।

হজ্জের নিয়্যাত
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ حَجًّا
"হে আল্লাহ! আমি হজ্জের জন্য উপস্থিত হলাম।"
এ সময় থেকে ঈদের দিন জামরাতুল আকাবাহে প্রথম কঙ্কর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত নিয়মিত তালবিয়াহ পাঠ করতে থাকুন।

মিনার উদ্দেশ্যে রওনা (৮ জিলহজ্জ) সুন্নাহ

৮ জিলহজ্জ মিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিন। নির্ধারিত তাঁবুতে অবস্থান করুন এবং সেখানে যোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজরের সালাত আদায় করুন।

হজ্জের তালবিয়াহ
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার ডাকে উপস্থিত। আমি আপনার ডাকে উপস্থিত। আপনার কোনো শরীক নেই, আমি আপনার ডাকে উপস্থিত। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, সকল নিয়ামত এবং সার্বভৌমত্ব একমাত্র আপনারই। আপনার কোনো শরীক নেই।"
চার রাকআতবিশিষ্ট সালাতগুলো দুই রাকআত করে আদায় করুন। তবে কোনো সালাত একত্রে আদায় করবেন না; প্রত্যেকটি নিজ নিজ সময়েই আদায় করুন।

আরাফার দিন (৯ জিলহজ্জ) রুকন

৯ জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর আরাফার উদ্দেশ্যে রওনা দিন। যোহরের সময় যোহর ও আসরের সালাত একসাথে (জাম') এবং সংক্ষিপ্ত (কসর) করে আদায় করুন। এরপর সূর্যাস্ত পর্যন্ত উকূফে অবস্থান করে বিনয়, একাগ্রতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দোয়া, যিকির এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনায় সময় অতিবাহিত করুন।

আরাফার দিনের সর্বোত্তম দোয়া
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।"
এ দিনটি হজ্জের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিন। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও জান্নাত প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "হজ্জ হলো আরাফা।"

মুযদালিফায় রাত্রিযাপন (৯ জিলহজ্জের রাত) ওয়াজিব

৯ জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর মাগরিবের সালাত আদায় না করে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা দিন। সেখানে পৌঁছে মাগরিব ও ইশার সালাত একসাথে আদায় করুন। এরপর রাতটি খোলা আকাশের নিচে বিশ্রাম ও ইবাদতে অতিবাহিত করুন।

তালবিয়াহ পাঠ অব্যাহত রাখুন
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
"হে আল্লাহ! আমি আপনার ডাকে উপস্থিত। আমি আপনার ডাকে উপস্থিত। আপনার কোনো শরীক নেই, আমি আপনার ডাকে উপস্থিত। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, সকল নিয়ামত এবং সার্বভৌমত্ব একমাত্র আপনারই। আপনার কোনো শরীক নেই।"
পরবর্তী দিনগুলোতে জামারাতে নিক্ষেপের জন্য এখান থেকে ছোট আকারের ৪৯ অথবা ৭০টি কঙ্কর সংগ্রহ করুন।

মিনায় প্রত্যাবর্তন (১০ জিলহজ্জ) সুন্নাহ

মুযদালিফায় ফজরের সালাত আদায়ের পর মাশআরুল হারামের নিকট কিবলামুখী হয়ে কিছু সময় আল্লাহর যিকির ও দোয়ায় মশগুল থাকুন। সূর্যোদয়ের পূর্বেই মিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিন।

মাশআরুল হারামে যিকির
اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
"আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।" (কিবলামুখী হয়ে এর সঙ্গে অন্যান্য দোয়াও করুন।)
এ সময় প্রচুর ভিড় ও দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হতে পারে। তাই ধৈর্য ধারণ করুন এবং শারীরিক শক্তি সঞ্চয় করে চলুন।

জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ (১০ জিলহজ্জ) ওয়াজিব

ঈদের দিন সকালে মিনায় পৌঁছে শুধু বড় জামারাত (জামরাতুল আকাবাহ)-এ সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় “আল্লাহু আকবার” বলুন।

কঙ্কর নিক্ষেপের যিকির
اللَّهُ أَكْبَرُ
"আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।" (প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় এটি বলুন। প্রথম কঙ্কর নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গেই তালবিয়াহ পাঠ বন্ধ করুন।)
সুন্নাহ হলো, জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপের সময় মক্কাকে বাম পাশে এবং মিনাকে ডান পাশে রেখে জামারাতের মুখোমুখি হয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করা।

হাদী (কুরবানি) (১০ জিলহজ্জ) ওয়াজিব

হাদীর জন্য একটি ছাগল বা ভেড়া কুরবানির ব্যবস্থা করুন। বর্তমানে অধিকাংশ হাজী নির্ভরযোগ্য কুরবানি ভাউচার অথবা অনুমোদিত হজ্জ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই হাদী সম্পন্ন করেন।

কুরবানির সময় দোয়া
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
"আল্লাহর নামে, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। হে আল্লাহ! এটি আপনার পক্ষ থেকে এবং আপনারই উদ্দেশ্যে।"
তামাত্তু' অথবা কিরান হজ্জ আদায়কারীদের জন্য হাদী প্রদান ওয়াজিব। ইফরাদ হজ্জ আদায়কারীর জন্য হাদী ওয়াজিব নয়।

চুল মুন্ডানো বা ছাঁটা (১০ জিলহজ্জ) ওয়াজিব

পুরুষরা মাথা সম্পূর্ণ মুন্ডিয়ে ফেলবেন (হালক), যা উত্তম; অথবা সমগ্র মাথার চুল সমানভাবে ছোট করবেন (তাকসীর)। নারীরা তাঁদের চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙুলের এক গিঁট পরিমাণ কেটে ফেলবেন।

এটি সম্পন্ন হলে আপনি তাহাল্লুলে আসগার (ইহরামের আংশিক সমাপ্তি)-এ প্রবেশ করবেন। এখন আপনি স্বাভাবিক পোশাক পরতে পারবেন এবং পুরুষরা সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারবেন। তবে দাম্পত্য সম্পর্ক তখনও নিষিদ্ধ থাকবে।

তাওয়াফুল ইফাদাহ (১০ জিলহজ্জ) রুকন

এরপর মক্কার মাসজিদুল হারামে গিয়ে হজ্জের অপরিহার্য তাওয়াফ (তাওয়াফুল ইফাদাহ) আদায় করুন। কা'বার চারদিকে সাত চক্কর সম্পন্ন করুন।

রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী দু'আ
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
"হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।"
এটি হজ্জের অন্যতম প্রধান রুকন। এটি আদায় না করলে হজ্জ সম্পূর্ণ হবে না। উত্তম হলো ১০ জিলহজ্জেই এটি আদায় করা; তবে পরবর্তী দিনগুলোতেও আদায় করা বৈধ।

হজ্জের সা'ঈ (১০ জিলহজ্জ) রুকন

সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী পথে সাতবার যাতায়াত করে হজ্জের সা'ঈ সম্পন্ন করুন। যারা তামাত্তু' হজ্জ করছেন, তাদের জন্য এটি হজ্জের একটি স্বতন্ত্র রুকন।

সাফার নিকট পৌঁছালে
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ
"নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।"
সাফা ও মারওয়ার উপর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দো'আ
لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ
"আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই, এবং তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সমস্ত মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করেছেন।"
তাওয়াফুল ইফাদাহ এবং এই সা'ঈ সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে আপনার পূর্ণ তাহাল্লুল (তাহাল্লুলুল আকবার) সম্পন্ন হবে। এরপর ইহরামের সব নিষেধাজ্ঞা, এমনকি বৈবাহিক সম্পর্কও, বৈধ হয়ে যাবে।

মিনায় অবস্থান (১১–১৩ জিলহজ্জ) ওয়াজিব

আইয়ামে তাশরীক (১১, ১২ এবং ইচ্ছা করলে ১৩ জিলহজ্জ) মিনায় অবস্থান করুন। প্রতিদিন যোহরের সময় শুরু হওয়ার পর ছোট, মধ্যম ও বড়—এই ক্রমে তিনটি জামারাতেই সাতটি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় “আল্লাহু আকবার” বলুন।

আইয়ামে তাশরীকের তাকবীর
اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
"আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।"
আপনি চাইলে ১২ জিলহজ্জে কঙ্কর নিক্ষেপ সম্পন্ন করে সূর্যাস্তের পূর্বেই মিনা ত্যাগ করতে পারবেন। তবে সূর্যাস্তের পূর্বে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ জিলহজ্জ পর্যন্ত অবস্থান করে সেদিনও কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। ১৩ জিলহজ্জ পর্যন্ত অবস্থান করা অধিক উত্তম।

বিদায়ী তাওয়াফ (তাওয়াফুল ওয়াদা') ওয়াজিব

বাংলাদেশে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করার আগে সর্বশেষ আমল হিসেবে কা'বার চারদিকে সাত চক্কর দিয়ে বিদায়ী তাওয়াফ (তাওয়াফুল ওয়াদা') আদায় করুন।

কবুলিয়াতের দো'আ
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
"হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।"
বিদায়ী তাওয়াফের পর সা'ঈ করতে হয় না। তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর যত দ্রুত সম্ভব মক্কা ত্যাগ করুন। তবে ঋতুবতী এবং প্রসবোত্তর রক্তস্রাবগ্রস্ত নারীদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ আদায়ের বাধ্যবাধকতা নেই।

কেন এখানে শুধুমাত্র তামাত্তু' হজ্জের ধাপগুলো দেখানো হয়েছে?

এই ইন্টারঅ্যাক্টিভ নির্দেশিকায় তামাত্তু' হজ্জ-এর ধাপগুলো দেখানো হয়েছে, কারণ বাংলাদেশ থেকে অধিকাংশ হাজী সংগঠিত হজ্জ প্যাকেজের মাধ্যমে এ পদ্ধতিতেই হজ্জ আদায় করেন। তাছাড়া সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী এটিই সর্বোত্তম হজ্জের পদ্ধতি, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সাহাবীগণকে গ্রহণ করতে নির্দেশ ও উৎসাহ প্রদান করেছিলেন। কিরানইফরাদ হজ্জের মূল কার্যক্রম তামাত্তু' হজ্জের সঙ্গে প্রায় একই। প্রধান পার্থক্য হলো ইহরামে প্রবেশ ও তা থেকে বের হওয়ার সময়, উমরা অন্তর্ভুক্ত থাকা বা না থাকা, এবং হাদী ওয়াজিব হওয়া বা না হওয়ার ক্ষেত্রে। একই বিষয় তিনবার পুনরাবৃত্তি না করে সহজবোধ্য একটি ধারাবাহিক নির্দেশিকা উপস্থাপন করা হয়েছে। আপনি যদি কিরান বা ইফরাদ হজ্জ আদায় করেন, তবে প্রয়োজনীয় পার্থক্যগুলো সম্পর্কে আপনার হজ্জ গাইড বা নির্ভরযোগ্য আলেমের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করুন।

হজ্জের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা

মদীনাতুল মুনাওয়ারা ভ্রমণের দিকনির্দেশনা

মাসজিদে নববী (আল-মাসজিদ আন-নববী) সফরের ইসলামী আদব ও দিকনির্দেশনা।

মাসজিদে নববী (ﷺ)

মদীনাতুল মুনাওয়ারা সফর করা হজ্জ বা উমরাহর কোনো আবশ্যিক আমল নয়। বরং এটি একটি স্বতন্ত্র ও অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ ইবাদত। মদীনায় যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মাসজিদে নববী যিয়ারত করা এবং সেখানে সালাত আদায় করা, যার প্রতিদান অত্যন্ত মহান।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"আমার এই মসজিদে এক ওয়াক্ত সালাত অন্য যেকোনো মসজিদে এক হাজার ওয়াক্ত সালাতের চেয়ে উত্তম; তবে মাসজিদুল হারাম ব্যতীত।" — সহীহ আল-বুখারী: ১১৯০; সহীহ মুসলিম: ১৩৯৪

মাসজিদে নববী সফরের আদব

1
দু'আ পাঠ করে প্রবেশ করুন

ডান পা আগে রেখে মাসজিদে নববীতে প্রবেশ করুন এবং বলুন:

بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي، وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ

অর্থ: "আল্লাহর নামে। রাসূলুল্লাহর প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ, আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।"

2
তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করুন

মাসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাআত তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করুন। সুযোগ ও নিরাপত্তা থাকলে, অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না দিয়ে রাওদাতুশ শরীফাহতে (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান, যা সবুজ কার্পেট দ্বারা চিহ্নিত) এ সালাত আদায় করার চেষ্টা করুন।

3
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর দুই সাহাবীকে সালাম দিন

নীরবে ও শান্তভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কবরের সামনে গিয়ে সালাম দিন। বলুন: "আস-সালামুকা 'আলাইক ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।" (আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক, হে রাসূলুল্লাহ।) এরপর সামান্য ডান দিকে সরে গিয়ে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু 'আনহু)-কে সালাম দিন: "আস-সালামু 'আলাইকা ইয়া আবা বকর।" তারপর আরও সামান্য ডান দিকে সরে গিয়ে উমর (রাযিয়াল্লাহু 'আনহু)-কে সালাম দিন: "আস-সালামু 'আলাইকা ইয়া 'উমার।"

4
বিদআত ও শির্ক থেকে বিরত থাকুন

<গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কবরের চারপাশের গ্রিল, দেয়াল বা অন্য কোনো অংশ স্পর্শ করা, মুছে বরকত গ্রহণের চেষ্টা করা বা চুম্বন করা বিদআত। তদ্রূপ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট দু'আ করা, তাঁর কাছে সাহায্য বা সুপারিশ প্রার্থনা করাও জায়েয নয়। সকল দু'আ কেবল আল্লাহর কাছেই করতে হবে এবং কিবলামুখী হয়ে করতে হবে।

5
মাসজিদে কুবা যিয়ারত করুন

অযু করে নিজ অবস্থানস্থল থেকে মসজিদে কুবায় যান এবং সেখানে দুই রাকাআত সালাত আদায় করুন। এটি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি সুন্নাহ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি নিজ ঘরে অযু করে মসজিদে কুবায় এসে সেখানে সালাত আদায় করে, সে একটি উমরাহর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।" (সুনান ইবন মাজাহ: ১৪১২)

6
বাকি কবরস্থান ও উহুদ যিয়ারত করুন (পুরুষদের জন্য)

পুরুষদের জন্য বাকি কবরস্থান (মাসজিদে নববীর পাশেই অবস্থিত), যেখানে বহু সম্মানিত সাহাবী সমাহিত আছেন, এবং উহুদের শহীদদের কবরসমূহ (যার মধ্যে হামযাহ رضي الله عنه-ও রয়েছেন) যিয়ারত করা সুন্নত। সেখানে গিয়ে তাঁদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও রহমতের দু'আ করুন।

সূত্র: IslamQA (নববী মসজিদ যিয়ারতের ইসলামী দিকনির্দেশনা)

হজ্জ ও উমরায় নারীদের জন্য বিশেষ বিধান

হজ্জ ও উমরাহ পালনকারী নারীদের জন্য সুন্নাহভিত্তিক বিশেষ বিধান, ছাড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।

১. মাহরামের সঙ্গে সফর

হজ্জ বা উমরাহর উদ্দেশ্যে একজন নারীর স্বামী অথবা মাহরাম (যাঁর সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিবাহ নিষিদ্ধ এমন পুরুষ আত্মীয়)-এর সঙ্গে সফর করা আবশ্যক। মাহরাম ছাড়া সফর করা বৈধ নয়।

২. ইহরামের পোশাক

নারীদের জন্য ইহরামের নির্দিষ্ট কোনো রং বা পোশাক নেই। তাঁরা শরীয়তসম্মত শালীন, ঢিলেঢালা ও পূর্ণাঙ্গ পোশাক পরবেন। ইহরাম অবস্থায় নিকাব ও হাতমোজা পরবেন না। তবে পরপুরুষের উপস্থিতিতে মাথার ওড়না বা অন্য কোনো কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিতে পারবেন।

৩. তালবিয়াহ পাঠ

পুরুষদের মতো উচ্চস্বরে তালবিয়াহ পাঠ করা নারীদের জন্য সুন্নাহ নয়। তাঁরা এমন নিম্নস্বরে তালবিয়াহ পাঠ করবেন, যাতে কেবল তিনি নিজে বা তাঁর একেবারে নিকটবর্তী নারীরা শুনতে পান।

৪. ঋতুস্রাবের বিধান

ইহরাম অবস্থায় ঋতুস্রাব শুরু হলেও ইহরাম বৈধ থাকে। তিনি মিনায় অবস্থান, আরাফায় অবস্থান, মুযদালিফায় রাত্রিযাপন, জামারাতে পাথর নিক্ষেপসহ হজ্জের অন্যান্য আমল করবেন। তবে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাওয়াফ করবেন না। যদি সাঈ সেই তাওয়াফের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে তাওয়াফ ও সাঈ উভয়ই পবিত্র হয়ে গোসল করার পর সম্পন্ন করবেন।

৫. ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়া (তাকসীর)

ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নারী কখনো মাথা মুন্ডন করবেন না। বরং চুল একত্র করে প্রান্ত থেকে আঙুলের একটি গিঁট পরিমাণ (প্রায় ১–২ সেন্টিমিটার) কেটে নেবেন।

ঋতুবতী নারীর বিদায়ী তাওয়াফ থেকে অব্যাহতি: যদি কোনো নারীর মক্কা ত্যাগের পূর্বে ঋতুস্রাব বা নিফাস শুরু হয় এবং তিনি ইতোমধ্যে ফরয তাওয়াফে ইফাদাহ সম্পন্ন করে থাকেন, তাহলে তাঁর জন্য বিদায়ী তাওয়াফ (তাওয়াফুল ওয়াদা) করা আবশ্যক নয়। তিনি কোনো কাফফারা বা হাদী ছাড়াই মক্কা ত্যাগ করতে পারবেন।
IslamQA-তে বিস্তারিত বিধান পড়ুন

ভিডিওর মাধ্যমে হজ্জ ও উমরাহ শিখুন

হজ্জ ও উমরাহর বিধান, ব্যবহারিক পদ্ধতি এবং সাধারণ ভুলগুলো এড়িয়ে চলার জন্য নির্বাচিত ভিডিও লেকচার ও প্রদর্শনী।

বিস্তারিত ধারাবাহিক লেকচার

হজ্জ ও উমরাহ বিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা

হজ্জের বিভিন্ন আমল, সাধারণ ভুল এবং ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা নিয়ে এই ধারাবাহিক লেকচারগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। প্লেলিস্টের সবগুলো ভিডিও দেখতে ভিডিও প্লেয়ারের পূর্ববর্তী (Previous) ও পরবর্তী (Next) বাটন ব্যবহার করুন।

ইউটিউবে সম্পূর্ণ লেকচার সিরিজ দেখুন
প্লেলিস্টের সব ভিডিও ব্রাউজ করুন
নির্বাচিত ভিডিও

ইহরামের কাপড় পরিধানের সঠিক পদ্ধতি

সৌদি আরবের হজ্জ ও উমরাহ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এই সংক্ষিপ্ত ভিডিওতে ইহরামের কাপড় সহজ ও সঠিকভাবে পরিধানের পদ্ধতি প্রদর্শন করা হয়েছে।

হজ্জ্বের লাগেজ প্রস্তুতি তালিকা

যাত্রার আগে প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে নিতে অনুসরণ করুন একটি পূর্ণাঙ্গ চেকলিস্ট।

হজ্জ্বের লাগেজ প্রস্তুতি তালিকা

খুব শিগগিরই একটি প্রিন্টযোগ্য চেকলিস্ট যুক্ত করা হবে, যাতে হজ্জ্বের সফরের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু সহজে প্রস্তুত করা যায়। এতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ওষুধ, পোশাক, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী এবং ভ্রমণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসের পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকবে।

এখনও কোনো প্রশ্ন আছে?

এই রিসোর্স পৃষ্ঠায় হজ্জ্ব ও উমরার ইবাদত যথাসম্ভব সহীহভাবে আদায় করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা একত্রিত করা হয়েছে। তবে ভ্রমণ, প্যাকেজ, সময়সূচি, আবাসন কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে আপনার অতিরিক্ত প্রশ্ন থাকতে পারে। সেসবের উত্তর আমরা একটি বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর বিভাগে সংকলন করেছি।

হজ্জ্ব ও উমরা সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর দেখুন